সরীসৃপ প্রানীরা কি ভাবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করেছিল,কেমন ছিল তাদের বসবাস
সরীসৃপদের বিবর্তন (Evolution of Reptiles)
পৃথিবীর প্রাণিজগতের ইতিহাসে সরীসৃপদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগে কার্বনিফেরাস যুগে প্রথম সরীসৃপের আবির্ভাব ঘটে। তারা মূলত উভচর প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়েছিল। সেই সময় পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্দ্র জলাশয় কমতে থাকে এবং শুষ্ক ভূমির বিস্তার ঘটে। উভচর প্রাণীরা ডিম পাড়ার জন্য পানির ওপর নির্ভরশীল থাকায় শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকতে পারত না। এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেই সরীসৃপদের জন্ম হয় এবং তারা পৃথিবীর প্রথম প্রকৃত স্থলজ মেরুদণ্ডী প্রাণীতে পরিণত হয়।
অ্যামনিয়োট ডিমের উদ্ভব 🥚
সরীসৃপদের বিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল অ্যামনিয়োট ডিম। উভচরের ডিম খোলসবিহীন ও নরম হওয়ায় তা পানির বাইরে শুকিয়ে যেত। কিন্তু সরীসৃপদের ডিম শক্ত বা চামড়ার মতো খোলসে ঢাকা থাকে, যার ভেতরে অ্যামনিয়ন, কোরিয়ন, এল্যান্টোইস নামক বিশেষ আবরণ ভ্রূণকে সুরক্ষা দেয়, অক্সিজেন সরবরাহ করে, খাদ্য মজুত রাখে এবং বর্জ্য নিষ্কাশনে সাহায্য করে। এর ফলে তারা পানির বাইরে স্থলভূমিতে নিরাপদে বংশবিস্তার করতে সক্ষম হয়।
শারীরিক অভিযোজন
সরীসৃপদের শারীরিক গঠনে ঘটে যায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তাদের ত্বক শুষ্ক, শক্ত এবং আঁশযুক্ত, যা শরীরের পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং বাইরের পরিবেশ থেকে সুরক্ষা দেয়। তারা সম্পূর্ণরূপে ফুসফুসের মাধ্যমে শ্বাস নেয়, ফলে উভচরের মতো ত্বক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তাদের কঙ্কাল মজবুত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শক্তিশালী হওয়ায় স্থলজ পরিবেশে সহজে চলাফেরা করতে পারত। এভাবে সরীসৃপরা শুষ্ক ভূমিতে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
সরীসৃপদের স্বর্ণযুগ
প্যালিওজয়িক যুগের শেষে সরীসৃপদের প্রথম আবির্ভাব হলেও মেসোজয়িক যুগ (২৫০–৬৫ মিলিয়ন বছর আগে) ছিল সরীসৃপদের প্রকৃত স্বর্ণযুগ। এই যুগকে বলা হয় “সরীসৃপের যুগ”। তখন ডাইনোসররা পৃথিবীর স্থলভাগ, জলভাগ ও আকাশে বিস্তার লাভ করেছিল। বিভিন্ন আকৃতির ও আকারের ডাইনোসর ছিল—বৃহৎ তৃণভোজী যেমন ব্র্যাকিওসরাস এবং ভয়ঙ্কর মাংসভোজী যেমন টিরানোসরাস রেক্স। একই সময়ে আকাশে উড়ন্ত সরীসৃপ যেমন প্টেরোসরাস এবং জলে বসবাসকারী ইচথিওসরাসও দেখা যেত।
প্রধান গোষ্ঠী
সরীসৃপদের মধ্যে বিবর্তনীয় দিক থেকে তিনটি প্রধান গোষ্ঠী ছিল।অ্যানাপসিড গোষ্ঠী, যাদের খুলিতে কোনো ছিদ্র থাকত না। এদের আধুনিক প্রতিনিধি হলো কচ্ছপ।ডায়াপসিড গোষ্ঠী, যাদের খুলিতে দুটি ছিদ্র থাকত। এ গোষ্ঠী থেকেই ডাইনোসর, কুমির, টিকটিকি, সাপ এবং আধুনিক পাখির পূর্বপুরুষের উৎপত্তি।সিনাপসিড গোষ্ঠী, যাদের খুলিতে একটি ছিদ্র থাকত। এদের থেকেই ধীরে ধীরে স্তন্যপায়ী প্রাণীর উদ্ভব ঘটে।
বিলুপ্তি ও টিকে থাকা
প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষে ডাইনোসরসহ বহু সরীসৃপ হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, বিশাল এক উল্কাপিণ্ডের পতন ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে পৃথিবীর পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হয়ে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং এর ফলে অধিকাংশ ডাইনোসর ধ্বংস হয়ে যায়। তবে সব সরীসৃপ বিলুপ্ত হয়নি। কুমির, কচ্ছপ, টিকটিকি ও সাপের মতো প্রাণীরা বেঁচে থাকে এবং আজও পৃথিবীতে টিকে আছে।
পাখির উদ্ভব
ডাইনোসরের এক বিশেষ শাখা থেকে আধুনিক পাখির উৎপত্তি ঘটে, যার প্রমাণ পাওয়া যায় জীবাশ্ম আর্কিওপটেরিক্স থেকে। আর্কিওপটেরিক্সের দেহে সরীসৃপের বৈশিষ্ট্য যেমন দাঁত ও লম্বা লেজ ছিল, আবার পাখির মতো ডানা ও পালকও ছিল। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে পাখিরা আসলে একধরনের বিবর্তিত সরীসৃপ।
অভিযোজন ও বৈশিষ্ট্য
সরীসৃপদের অভিযোজন ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তারা শুষ্ক পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল আঁশযুক্ত চামড়া, কার্যকর ফুসফুস, শক্ত কঙ্কাল ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, এবং খোলসযুক্ত ডিমের কারণে। তবে তারা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণী ছিল না; পরিবেশের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত। এজন্য তাদের বলা হয় শীতল রক্তের প্রাণী (cold-blooded animals)।
বিবর্তনীয় গুরুত্ব
সরীসৃপদের বিবর্তন শুধু তাদের নিজস্ব অস্তিত্ব নয়, বরং পৃথিবীর প্রাণিজগতের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এদের থেকেই পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর উৎপত্তি হয়েছে। ফসিল রেকর্ডে যেমন আর্কিওপটেরিক্স পাখির পূর্বপুরুষ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি সিনাপসিডদের থেকেই ধাপে ধাপে স্তন্যপায়ীদের বিবর্তন ঘটেছে।
আজকের পৃথিবীতে সরীসৃপরা সরাসরি ডাইনোসরের মতো আধিপত্য বিস্তার না করলেও তারা জীববৈচিত্র্যের একটি অপরিহার্য অংশ। কুমির, সাপ, টিকটিকি ও কচ্ছপ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে টিকে থেকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখছে। সরীসৃপরা প্রমাণ করে যে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণীরা কিভাবে পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করে এবং ধীরে ধীরে নতুন প্রাণী গোষ্ঠীর জন্ম দেয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সরীসৃপদের বিবর্তন পৃথিবীর প্রাণিজগতের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। উভচর প্রাণীর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তারা স্থলজ জীবনে সফল হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে এদের থেকেই পাখি ও স্তন্যপায়ীর মতো উন্নত প্রাণীর উদ্ভব ঘটেছে। তাই সরীসৃপদের ইতিহাস শুধু প্রাগৈতিহাসিক কালের গল্প নয়, বরং আধুনিক প্রাণিজগতের মূল ভিত্তির গল্পও বটে।
রেফারেন্স
Benton, M. J. (2015). Vertebrate Palaeontology. Wiley Blackwell.
Carroll, R. L. (1988). Vertebrate Paleontology and Evolution. W. H. Freeman.
Brusatte, S. (2018). The Rise and Fall of the Dinosaurs. Pan Macmillan.
Online resources: National Geographic, Smithsonian Museum of Natural History.
