খোলা দরজা, ফেসবুকের ছন্দ কথা ভালো লাগার মতো
খোলা দরজা, ফেসবুকের ছন্দ কথা ভালো লাগার মতো
খোলা দরজা
-কাজল মুখোপাধ্যায়
আমি দেরিতে ফিরি,সব সময় দেরিতে
যখন ফেরার কোনো ঘোষণা থাকে না,
যখন কেউ আর ধরে নেয় না,আমি আসব।
ট্রেনের কামরায় বসে,
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম
একটা শহর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল
আরেকটা শহরে,আমি প্রবেশ করছিলাম।
আমাকে কেউ চিনতে পারছিল না,
আমি নিজেকেও কি ঠিক চিনতে পেরেছি?
এই বয়সে,চেনা মুখগুলোর সামনে
অপরিচিত হয়ে যাওয়াই, বড় ব্যর্থতা।
বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে
আমি ভাবছিলাম,দরজা বন্ধ থাকলে,
আমি কী করব? ফিরে যাব?
না কি দাঁড়িয়ে থাকব ভোরের অপেক্ষায়?
আমি শিখেছি ফিরে যেতে,
শহর আমাকে এটা শিখিয়েছে,
শিখিয়েছে চাকরি গেলে কীভাবে,
অন্য ভাবে নিজের পরিচয় দিতে হয়,
ব্যর্থ হলে নিজে থেকে সরে আসতে হয়।
দরজাটা খুলেছিল, কিন্তু
কোনো ভূমিকা ছাড়াই
মা শুধু বলেছিলেন,“এসেছিস?”
এই শব্দে,আমার অভিমানগুলো ভেঙেছিল।
মা কোনো হিসেব রাখেননি,
টাকা পাঠিয়েছি কিনা,
ফোন করেছি না করিনি,
কত কথা গোপন রেখেছি।
তিনি জানতেন,মানুষের জীবনে
সব হিসেব সংখ্যায় হয় না।
ঘরে ঢুকে,আমি বুঝেছিলাম
এই ঘরটা বদলায়নি
শুধু আমি বদলে গেছি।
আমার বসার জায়গায়,অপরাধ বসে আছে
আমার শোবার ঘরে আছে অজানা ভয়।
মা ভাত বেড়ে রেখেছিলেন,
খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেননি
কোথায় ভুল হল
কবে থেকে এই অবস্থার শুরু হল?
তিনি জানতেন,প্রশ্নগুলোর উত্তর
ঠিকঠাক বলা যায় না।
পরদিন সকালটা ছিল বেশ অস্বস্তির
পাড়া আমাকে দেখছিল চুপচাপ,
এই চুপ করে দেখার ভেতরেই
সবচেয়ে জোরে কথা থাকে।
কেউ বলছিল না
তবু আমি যেন শুনতে পাচ্ছিলাম,
“ফিরে এসেছে।”
ফেরা শব্দটা,সব সময় সুখের নয়
কখনও কখনও ,এটা মানুষের কাঁধে
আরেকটা বোঝা।
আমি নতুন করে শুরু করি
ছোটো করে,লজ্জা লুকিয়ে,দাবি ছাড়া।
টিউশনের টাকাটা হাতে নিয়ে
আমি বুঝি,সম্মান বড় অঙ্কে আসে না,
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মধ্যে থাকে,
সেটা আপাতদৃষ্টিতে ছোটো হলেও।
মা জিজ্ঞেস করেননি,কত রোজগার হচ্ছে
তিনি শুধু জিজ্ঞেস করেছেন,“তোর চলবে তো?”
এই প্রশ্নে অর্থনীতি নেই, মাতৃস্নেহ আছে।
ঋণের চিঠি আসে,আমি ভয় পাই,
কিন্তু ভয় পেয়ে লুকোই না,এটাই আমার নতুন শিক্ষা।
আমি মাকে সব বলি,মা চুপ করে থাকেন
চুপ করে থাকা,অনেক সময়
সবচেয়ে বাস্তব প্রতিক্রিয়া।
তিনি বলেন,“সময় লাগবে।”
আমি জানি,এই কথায় প্রতিশ্রুতি নেই
তবু এই কথাটুকু,আমাকে দাঁড়াতে দেয়।
রাতে আলো জ্বলে থাকে,
কখনও মা জ্বালান,কখনও আমি
আলোটা কার জন্য,তা ঠিক পরিষ্কার নয়।
আমি জানি,এই আলো
সাফল্যের নয়,এই আলো
এড়িয়ে না যাওয়ার।
আমি জানি না,বড় কিছু হবে কিনা
পাড়ার দৃষ্টি বদলাবে কিনা
ঋণ পুরো শোধ হবে কিনা।
আমি শুধু জানি, এখন আমি দরজার ভেতরে
আর বাইরে দাঁড়িয়ে নেই।
দরজা অনেক আগে থেকেই খোলা ছিল
আমি শুধু দেরি করে বুঝেছি।
তাই কোনো অলৌকিক মুক্তি চাই না,
কোনো ঘোষণা, কোনো বিজয়মালা নয়।
শুধু চাই,এই দরজাটা যেমন আছে
তেমনই থাকুক,অল্প খোলা
আলোর জন্য,ফেরার জন্য
ভুল করে দাঁড়ানোর জন্য।
যদি অন্য কোনোদিন,আবার হেরে যাই
তবু যেন অন্য পরিচয় নিতে না হয়,
অন্য মুখোশ পরতে না হয়,
নিজেকে লুকোতে না হয়।
কারণ,আমি বুঝেছি,জীবনে বড় সাফল্য
মূলে ফিরে আসা নয়,এড়িয়ে না যাওয়া।
